Friday, September 18, 2026

হিমু নাম্বার টু

 -হিমালয়।

-জি বাবা। আমি কি তোমাকে স্বপ্নে দেখছি?
-স্বপ্ন ছাড়া তোর সাথে আমার দেখা হয়েছে কখনো?
-না বাবা। আসলে সারাদিন ঘরের মধ্যে থাকি তো... কোনটা স্বপ্ন কোনটা বাস্তব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
-ফালতু কথা বাদ দে। তুই সামনে বিপদের আছিস। তাই তোকে সতর্ক করতে আসছি।
-বাবা বলো।
-আমি তোর জন্য যে উপদেশনামা দিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে একটা উপদেশ যোগ হবে।
-কি? 
-টোপ গেলা যাবে না, টোপ গেলা যাবে না, টোপ গেলা যাবে না।
-বাবা ঠিক বুঝলাম না।
-বুঝতে হবে না। ঘুম ভাঙলে ঠিকই বুঝতে পারবি।
-বাবা, তুমি জ্যাক স্প্যারো কে চেনো?
-না। হঠাৎ এই কথা কেন?
-পাইরেটস অব দ্যা ক্যারেবিয়ান। ক্যপ্টেইন স্প্যারো। ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বলে। তোমার সাথে মিল দেখছি। ক্রস কো-রিলাসান ওয়ান হবে...

-লুলামি বাদ দে। আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেখাস না।  তুই রিসেন্টলি ছোটো একটা টোপ খেয়ে ফেলেছিস। ছোটো সাইজ টোপ। মিডিয়াম বা বড় সাইজ দিলে তোর বিপদ হতো। রিসেন্টলি এক মেয়ে তোকে পটানোর চেষ্টা করছে।
 ইগ্নোর কর। মেয়েদের থেকে দূরে থাকবি। আমার রিকুয়েস্ট। 
-তুমি কিভাবে জানলে বাবা?
-তুই টোপ গিলেছিলি বলে হয়েছে। ভাগ্যিস পুরাটা গিলিস নি। পুরাটা গিললে তোর আজীবন মহাপুরুষ হবার চান্স মিস হয়ে যেত।
-বাবা, রুপা নামের একটা মেয়ে আমাকে অনেকটা দুর্বল করে ফেলেছে।  তারপর হঠাৎ চলে গেছে। whatsapp এ কথা হতো। এখন কোনো খোঁজ নাই। চলে গেসে। কোনো কারণ ছাড়াই। আমি ওকে ফিরিয়ে আনতে চাই। উপায় বলো। তুমি উপায় জানো।  
 
-যে গেছে তাকে যেতে দে। ওকে ফিরিয়ে আনলে বিপদ হবে।
 খবরদার এসব আবেগের কাছে হার মানবি না। সরে আসবি। 
-বাবা তুমি জানো আমার মনের অবস্থা কি।
-মনের কথা শুনে পৃথিবী চলে না। পৃথিবী চলে উপরওয়ালার ইশারায়। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায়। তুই রুপাকে পাবি না। নিয়মিত নামাজ পর। ভণ্ডামি বাদ দে। সব ঠিক হয়ে যাবে। 
-বাবা রুপা কোথায়?
-শামিম নামে এক ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সাথে কাল ওর বিয়ে। আজ হলুদ হয়েছে। ছেলেটা অনেক ভালো। BUET থেকে পড়েছে।  রুপাকে ভালো রাখবে। তোকে আজাইরা টেনশান নিতে হবে না। 
এরপরও তোর জীবনে রুপা আসবে। প্রত্যেকটা রুপাই তোর কাছে একই রকম মনে হবে।  
-বাবা আমার এই রুপাকেই লাগবে। 
-হিমু, আমি যা বলছি তা শোন। পৃথিবীর সব ছেলেই হিমু আর সব মেয়েই রুপা। 
তোকে মহাপুরুষ হতে হবে। মহাপুরুষদের কোন গার্লফ্রেন্ড থাকে না। এইটা তোর জীবনের বড় বাঁধা ছিলো। শুকরিয়া আদায় কর। এরপরও হয়তোবা তোর জীবনে মেয়ে আসবে। তার মাঝে হয়তো তুই আগের রুপাকে খুঁজে পাবি তোকে একইভাবে মায়াজালে আবদ্ধ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তোকে মায়ার জালে পা রাখা যাবে না। তোকে মায়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে।   
-বাবা। আমি মায়াজালের খুব কাছে থেকে ঘুরে এসেছি। আর এর ধারে কাছেও যেতে চাই না। আর হ্যা, আমি মহাপুরুষও হতে চাই না
-তোকে মহাপুরুষ হতে হবে না। তুই হিমু

লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পরি আমি। পাশের ফ্ল্যাটের টিভির তীব্র আওয়াজে ঘুম ভাঙে আমার। দীর্ঘ ঘুমের ক্লান্তি। মনে হয় রিপ ভ্যান উইংকেল এর মতো দীর্ঘ ঘুম থেকে উঠলাম আমি। আচ্ছা, রিপ ভ্যান উইংকেল কি কখনো মায়ার ফাঁদে পা দিয়েছিলো? পড়ে দেখতে হবে।

ঘুমটা ভাঙতেই whatsapp-টা uninstall করে দেই আমি। Facebook id টা ডিলিট করে দেই মোবাইল ফোন থেকে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ করতে খুব বিরক্ত লাগে। মোবাইল ফোনটা খুব অসহ্য লাগে। খালা কি করতে এটা দিয়েছিলো কে জানে। ফোন দিয়ে বেচারীর লাভ হয় না। মেসেঞ্জারে মেসেজ দিয়ে রাখে। তাও আবার হয়তো দেখি তিন চারদিন পর। মোবাইল ফোনটা ফকির নসিমন মিয়ার ছেলেটাকে দিয়ে দেয়া যায়।  এটা পেয়ে ও হয়তো তার ছেলেটা আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মতো খুশি হবে। সেই খুশি দেখে নসিমন মিয়ার জীবনের সব দুঃখ ঘুচে যাবে...  

কেনো জানি মনে হচ্ছে Whatsapp  এ আজ বিয়ের অনেকগুলা ছবি পাঠাবে রুপা। বলবে- হিমু, বলোতো কোনটা বেশি সুন্দর? ওইটা প্রো-পিক বানাবো।

ও কোনো রিপ্লাই পাবে না। তারপর ফেইসবুকে খুঁজবে। ওখানেও পাবে না। তারপর বাধ্য হয়েই ওর হাসবেন্ডকে বলবে-"ওগো বলোতো কোন ছবিটা ভালো হয়েছে?" ওর নিষ্পাপ হাসিতে শামিম সাহেবের সব পাপ দূর হয়ে যাবে। চেম্বারের ব্যাবসায় উন্নতি হবে।

বিয়ের কার্ডটা নছিমন মিয়াকে দিয়ে দিয়েছি। ফ্যামিলি নিয়ে যাবে ও।  গার্ড ওকে প্রথমে ঢুকতে দেবে না। ও চিল্লাচিল্লি করবে। রুপা ওকে চিনবে। না  চেনার কোনো কারণ নেই। স্পেশাল বিয়ের কার্ড ছিল ওটা। শুধুমাত্র কালার ব্লাইণ্ডরাই ওই কার্ডের লিখা পড়তে পারে। 


কেন জানি মনে হচ্ছে নছিমন মিয়াও কালার ব্লাইণ্ড। না হলেই বা কি?  ও নিজেই ম্যানেজ করে নেবে। আজকের দাওয়াতটা ফকির নছিমন মিয়া আজীবন মনে রাখবে। বলবে- হিমু বাই। আপনে মানুষ না। মানুষের থেকে উঁচু লেভেলের... পীর মুরিদ লেভেলের। মেয়েটা বড়ই সৌন্দর্য আছিলো... 

হাঁটতে বের হবো আজ। আজকের রুটটা পুরানা পল্টনের সামনে দিয়ে হবে না রুপাদের বাসা ওখানে। আজ যাব সোজাসুজি গাজীপুরেরে দিকে।

খালি পায়ে রাস্তায় নেমে পরি আমি।  সামনের হিজাব পড়া মেয়েটাকে পেছন থেকে রুপা বলে মনে হচ্ছে এটা কি বিভ্রম? Hallucination?  আসলেই কি ও রুপা? হয়তোবা। অথবা না।হয়তোবা বাবার কথাই ঠিক। পৃথিবীর সব ছেলেই হিমু আর সব মেয়েই রুপা। সবার গন্তব্য একটাই। চাওয়া পাওয়া গুলোও কেন জানি একইরকম। 

কেনো জানি মনে হচ্ছে মেয়েটার নাম দুই অক্ষরের। রিপ ভ্যান উইংকেল তার প্রিয় ক্যারেকটার। সবুজ ওর প্রিয় কালার। আমার সাথে এই একটা জায়গায়ই হয়তো ওর মিল। কারন সবুজ ও দেখতে পায় না। হালকা লালকে সবুজ ভাবে। কখনও ডিপ সবুজকে লাল ভেবে ভুল করে। আবার কেউ যদি জিজ্ঞেস করে-'আপনার প্রিয় কালার কি?' তখন কোন কিছু চিন্তা না করেই আশ্চর্যজনকভাবে উত্তর দেয়-'গ্রিন'।  
মানুষ আসলেই অদ্ভুত। তাই না? যা পায় না তার প্রতি কত বেশী আগ্রহ? 

নাম ধরে ডেকে মেয়েটাকে ভড়কে দেবো? থাক। হিমুরা কাউকে পেছন থেকে ডাকে না। এ ব্যাপারে তাদের কোনো পারমিশান নেই।

কড়া রোদ। সামনে নিজের ছায়াকে নিজেই চিনতে পারছি না। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, আমার নিজের ছায়া আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে।  নিঃশব্দে আমার পাশে পাশে চলা শুরু করেছে।  কেন যেন মনে হল- আমার ছায়া আমার সাথে কথা বলছে- তুই কে? একা  কেন? সাথে কেউ নাই?  ওকে ধমক দিলাম একটা। বললাম- আমি হিমু।' ও কোনো কথা বলছে না। তবে মনে হল বেশ মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে।  

পরক্ষনেই বুঝলাম আমার ছায়ার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে কাটিয়ে দেয়া যায়। পৃথিবীতে অনেক কিছুকেই বিশ্বাস করা যায় না। তবে নিজের ছায়াকে অবিশ্বাস করার কিছু নেই।আমি বললাম-   'জানিস, তুই যে আমার সঙ্গে আসছিস আমার খুব ভালো লাগছে। মাঝে মাঝে খুব একা লাগে, বুঝলি? আমার সঙ্গে কী আছে জানিস? পদ্ম-নীলপদ্ম! পাঁচটা নীলপদ্ম নিয়ে ঘুরছি। কী অপূর্ব পদ্ম কাউকে দিতে পারছি না। দেয়া সম্ভব নয়। হিমুরা কাউকে নীলপদ্ম দিতে পারে না..’

চৈত্রের রোদ বাড়ছে। রোদটাকে আমি জোছনা বানানোর চেষ্টা করছি। বানানো খুব সহজ- শুধু ভাবতে হবে- আজ গৃহত্যাগী জোছনা উঠেছে- চারদিকে থৈথৈ করছে জোছনা । ভাবতে ভাবতেই একসময় রোদটাকে জোছনার মতো মনে হতে থাকবে ।

আজ অনেক চেষ্টা করেও তা পারছি না। ক্লান্তিহীন হাটা হেঁটেই যাচ্ছি...